দ্রব্যমূল্য বাড়লেও কমেছে মূল্যস্ফীতি

0

দ্রব্যমূল্যের উত্তাপ কমেনি, তবুও মূল্যস্ফীতি কমেছে: জনমনে প্রশ্ন

রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য যখন ঊর্ধ্বমুখী, তখন বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) জানিয়েছে ভিন্ন খবর। তাদের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি সামান্য কমেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে যেখানে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯.৬৯ শতাংশ, মার্চে তা দাঁড়িয়েছে ৯.৬৭ শতাংশে। এই সামান্য হ্রাস সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের জিজ্ঞাসা তৈরি করেছে – দ্রব্যমূল্য বাড়ার পরও মূল্যস্ফীতি কমার এই পরিসংখ্যান কতটা বাস্তবসম্মত?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ এই নয় যে পণ্যের দাম কমেছে। বরং এর মানে হলো, দাম বৃদ্ধির হার কিছুটা ধীর হয়েছে। অর্থাৎ, গত মাসে যে হারে দাম বেড়েছিল, এই মাসে তার চেয়ে সামান্য কম হারে বেড়েছে। কিন্তু বাজারে এখনো নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য ভোক্তাদের নাভিশ্বাস ফেলছে, যা বিবিএস-এর পরিসংখ্যানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার ফারাক তৈরি করছে।

বিবিএস-এর তথ্য বিশদভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে কিছুটা স্বস্তি মিলেছে। ফেব্রুয়ারি মাসের ১০.৭০ শতাংশ থেকে কমে মার্চে এটি ৯.৮৭ শতাংশে নেমে এসেছে। মৌসুমী সবজির সরবরাহ বৃদ্ধি এবং সরকারের বাজার তদারকি কার্যক্রম এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিতে উল্টো চিত্র দেখা গেছে, যা ফেব্রুয়ারি মাসের ৮.২৯ শতাংশ থেকে বেড়ে মার্চে ৯.৩৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো পরিষেবা খাতের খরচ বৃদ্ধি, আবাসন ভাড়া, পরিবহন ব্যয়, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের খরচ বৃদ্ধিকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয় বৃদ্ধিও এই খাতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা সরাসরি ভোক্তার পকেটে চাপ সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রা নীতি গ্রহণ করেছে। সম্প্রতি নীতি সুদহার বা রেপো রেট ৫০ বেসিস পয়েন্ট বাড়িয়ে ৮.০০ শতাংশ করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, বাজারে টাকার প্রবাহ কমিয়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করে মূল্যস্ফীতিকে সহনীয় পর্যায়ে আনা। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেবল মুদ্রা নীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী রাজস্ব নীতির সমন্বয় এবং বাজারে কার্যকর তদারকি।

অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, "সামগ্রিকভাবে মূল্যস্ফীতি সামান্য কমা ইতিবাচক হলেও তা এখনো অত্যন্ত উচ্চ। নন-ফুড ইনফ্লেশন বেড়ে যাওয়া বড় উদ্বেগের বিষয়। মুদ্রা নীতিকে আরও কার্যকর করতে হলে টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা জরুরি। একই সাথে সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নতি এবং সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সরকারের আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।"

সাধারণ ভোক্তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যান যাই বলুক না কেন, বাজারের বাস্তবতা ভিন্ন। প্রতিদিনের চাল, ডাল, তেল, লবণ, চিনিসহ সব মৌলিক পণ্যের দাম এখনো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। এই অবস্থায়, মূল্যস্ফীতি কমার খবর তাদের জন্য কোনো স্বস্তি বয়ে আনতে পারছে না। এই অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্তি পেতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে আছে দেশের আপামর জনগণ।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ
* Please Don't Spam Here. All the Comments are Reviewed by Admin.
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)

#buttons=(Accept !) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Learn More
Accept !
To Top